ড্রিমারিয়াম
যেখানে স্বপ্ন সত্যি হয়

লাল সাইনবোর্ড
ড্রিমারিয়ামের ভেতরে
উপহার
কনসার্ট
প্রতিদিন ভোর সাড়ে পাঁচটা নাগাদ আলোটা জ্বলে উঠত। উজ্জ্বল লাল আলো। গ্রামের লোকেরা বুঝতে পারত না এর মানে কী। কালো আলখাল্লা আর ময়ূরের পালক গোঁজা বেগুনি ফেল্টের টুপি পরা এক রহস্যময় মানুষ কয়েক মাস আগে পরিত্যক্ত আচারের কারখানাটা কিনেছিলেন। রোজ একদল মজুর কাঠের তক্তা, রঙের টিন, হাতুড়ি, নল, ইস্পাতের পাত নিয়ে আসা-যাওয়া করত।
“লোকটা করছেটা কী? কে লোকটা?”
অজানা জায়গা থেকে আসা এই মানুষটির কথায় একটু টান ছিল, আর তাঁর ছিল ঘন বাদামি দাড়ি।
“উনি কোথা থেকে এসেছেন ঠিক জানি না,” বলল মুদি। “রোজ লেবু কিনতে আসেন। ‘আমাকে কিছু মিষ্টি লেবু দেবেন?’ উনি জিজ্ঞেস করেন। মিষ্টি লেবু? ভাবো একবার,” মাথা নাড়তে নাড়তে বলল মুদি।
১৯ ডিসেম্বর সাইনবোর্ডটা প্রথমবার জ্বলে উঠল। পাড়ায় ওটাই ছিল একমাত্র আলো-জ্বলা সাইনবোর্ড।
“ওটা আবার কী?” কারখানায় যাওয়ার পথে বলল মজুররা। বাচ্চারা খুব ধাঁধায় পড়ে গেল। সাইনবোর্ডটা উজ্জ্বল লাল। অক্ষরগুলো বাঁকানো, যেন সবগুলো একসঙ্গে জোড়া।
ড্রিমারিয়াম, লেখা ছিল সাইনবোর্ডে।
অ্যালিসা ছিল চুপচাপ মেয়ে। সব কথা বলত তার দিদি। সত্যি বলতে, তার দিদি কথা বলা থামাতই না। খাবার টেবিলে অ্যালিসা চুপ করে বসে শুনত। কখনো সে কিছু বলার চেষ্টা করলে, তার দিদি ব্যঙ্গের হাসি হাসত।
“আরে বল না। এত দেরি হচ্ছে কেন? বলে ফেল। থাক। আমি জানি তুই কী বলতে চাস।”
আর তার দিদি তার বাক্যগুলো তার হয়ে শেষ করে দিত।
অ্যালিসা কথা বলতে পারত না। আসলে কখনো সুযোগই পায়নি। তার বদলে অ্যালিসা হয়ে উঠল এক চমৎকার শ্রোতা — এক পর্যবেক্ষক।
একদিন স্কুলে যাওয়ার পথে সে পুরোনো আচারের কারখানার পাশ দিয়ে যাচ্ছিল আর উজ্জ্বল লাল সাইনবোর্ডটা দেখল।
ড্রিমারিয়াম, লেখা ছিল সাইনবোর্ডে।
অ্যালিসা থমকে দাঁড়াল — মুগ্ধ হয়ে। লাল রংগুলো যেন তার সামনে নাচছিল।
হঠাৎ কালো আলখাল্লা আর ময়ূরের পালক গোঁজা বেগুনি ফেল্টের টুপি পরা মানুষটি দরজায় এসে দাঁড়ালেন।
“সুপ্রভাত, মা। কেমন আছ? ভেতরে আসবে?”
“আমি। আমি। আমি।”
অ্যালিসার মুখ থেকে কথা বেরোতে চাইছিল না।
মানুষটি ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করলেন। তিনি একটা কোমল, সদয়, সব-জানা হাসি হাসলেন, কিন্তু অ্যালিসার বাক্যটা তার হয়ে শেষ করে দিলেন না।
“আমি স্কুলে যাচ্ছি,” বলল অ্যালিসা, নিজের বাক্য নিজে শেষ করতে পেরে অবাক হয়ে। সে হাসল আর একটা গভীর শ্বাস নিল।
“বুঝেছি,” বললেন মানুষটি। “আমার নাম মিস্টার পেরিউইঙ্কল। স্কুলের পর আমার বিশেষ অতিথি হয়ে একবার এসো। তোমাকে ড্রিমারিয়াম ঘুরিয়ে দেখাতে পারলে আমি খুব খুশি হব।”
অ্যালিসা মাথা নেড়ে হাসল।
“আচ্ছা,” সে বলল।
“আচ্ছা,” আলতো করে টুপিটা ছুঁয়ে উত্তর দিলেন মিস্টার পেরিউইঙ্কল।
“চাও,” তিনি বললেন।
“চাও।”
স্কুলে অ্যালিসা প্রায় মনই দিতে পারছিল না।
“অ্যালিসা!” চেঁচিয়ে উঠলেন তার শিক্ষিকা মিসেস জেলিনস্কি। “মন দাও, সোনা। তুমি জানালা দিয়ে তাকিয়ে আছ। বাইরে মেঘ ছাড়া কিছুই নেই।”
স্কুলের ঘণ্টা বাজতেই অ্যালিসা যত দ্রুত পারে হাঁটা দিল তার বিকেলের দেখা করতে।
“এত তাড়াতাড়ি কোথায় যাচ্ছিস?” খোঁচা দিল অন্য বাচ্চারা। “একা একা আরও বই পড়ার তাড়া?” তারা হাসল।
অবশেষে অ্যালিসা পৌঁছাল। উজ্জ্বল লাল সাইনবোর্ডটা তখনো জ্বলছে।
ড্রিমারিয়াম, লেখা ছিল তাতে।
আর হঠাৎ মিস্টার পেরিউইঙ্কলও এসে হাজির হলেন।
“তুমি আসবে ঠিক করেছ দেখে খুশি হলাম।”
তিনি একটু থামলেন, অ্যালিসা কখন তার নাম বলবে তার অপেক্ষায়।
“অ্যালিসা,” সে উত্তর দিল।
“কী চমৎকার নাম,” উত্তর দিলেন মিস্টার পেরিউইঙ্কল। “ড্রিমারিয়ামে স্বাগত, যেখানে স্বপ্ন সত্যি হয়। ভেতরে এসো।”
ভেতরে ঢুকতেই অ্যালিসা যেন সময়ের হিসাব হারিয়ে ফেলল। মনে হলো যেন সে একটা মেঘের ভেতরে ঢুকেছে। দেয়ালে মেঘ আঁকা। তার ভেতরে আঁকা উড়ন্ত সিগাল। একটা ঠান্ডা কুয়াশা তাকে ছুঁয়ে গেল, মেঘের ভাপের মতো।
“আমরা কোথায়?” সে জিজ্ঞেস করল।
“তুমি তোমার স্বপ্নের ভেতরে ঢুকছ,” উত্তর দিলেন মিস্টার পেরিউইঙ্কল।
তারপর তারা এল একটা বড় ঘরে, যেখানে একটা মোটা কাঠের টেবিলের ওপর বসানো একটা বিশাল গ্লোব। সেটা সুন্দর, মৃদু হলুদ আলোয় জ্বলছিল।
“এসো, স্বপ্নের টেবিলে আমার সঙ্গে বসো,” বললেন মিস্টার পেরিউইঙ্কল।
চেয়ারটা ছিল তুলতুলে আর নরম। অ্যালিসা তাতে ডুবে গেল। তার মনে হলো সে যেন একটা মেঘের মধ্যে ভাসছে, আর গোটা পৃথিবী তার সামনে।
“পৃথিবী তোমার সামনে, মা। যদি যা খুশি করতে পারতে, কী করতে?”
“আমি চাই দিদি শেষ করার আগে আমি নিজে কথা বলে আমার ভাবনাগুলো শেষ করতে পারি।”
“তোমার ভেতরে একটা সুন্দর কণ্ঠ আছে, অ্যালিসা। সত্যিই, সেটা তোমাকে পৃথিবীর সঙ্গে ভাগ করে নিতেই হবে।”
ঠিক তখনই একটা রংবেরঙের গানের পাখি উড়ে এসে অ্যালিসার পাশে চেয়ারের কিনারায় বসল।
“এ হলো মেলিতা,” হেসে বললেন মিস্টার পেরিউইঙ্কল। “ওর গলা মধুর মতো। ও যেমন করে, তুমিও তেমন করো।”
মিস্টার পেরিউইঙ্কল অর্কেস্ট্রার কন্ডাক্টরের মতো দুই হাত তুললেন। গানের পাখি মেলিতা গাইতে শুরু করল অ্যালিসার জীবনে শোনা সবচেয়ে সুন্দর গান — কথাহীন এক গান, কিন্তু কথায় যতটা অর্থ ধরা যায়, তার চেয়েও বেশি অর্থে ভরা।
“এবার তোমার পালা, অ্যালিসা।”
অ্যালিসা মুখ খুলল। কিছুই বেরোল না, একেবারে কিছুই না।
মিস্টার পেরিউইঙ্কল মাথা নাড়লেন।
অ্যালিসা তাঁর চোখের দিকে তাকাল। হলুদ গ্লোবের আভায় সেগুলো ঝিকমিক করছিল। সে মেলিতার চোখের দিকে তাকাল। সেগুলোও ঝিকমিক করছিল।
লা, লা, লা। ফা, লা, লা। লা, লা।
ড্রিমারিয়ামের মেঘের ভেতর দিয়ে উড়ে চলা নিজের কণ্ঠের শক্তি অ্যালিসা বিশ্বাসই করতে পারছিল না।
মিস্টার পেরিউইঙ্কলের গাল বেয়ে একফোঁটা চোখের জল গড়িয়ে পড়ল। বিস্ময়ে মেলিতার চোখ বড় বড় হয়ে উঠল। অ্যালিসা গাইতে শুরু করল তাদের জীবনে শোনা সবচেয়ে সুন্দর সুর।
তারপর সে থামল, আর সবচেয়ে মধুর এক নীরবতা ড্রিমারিয়াম ভরিয়ে দিল। শুধু কুয়াশার সোঁ সোঁ শব্দ তাদের চারপাশে ঘুরপাক খাচ্ছিল।
অ্যালিসার ঠোঁট দুটো ফাঁক হয়ে ফুটে উঠল তার জীবনের সবচেয়ে চওড়া হাসি।
“তোমার, অ্যালিসা, একটা গুণ আছে। আমাদের সবারই গুণ আছে, অনেক, অনেক গুণ। এই জীবনে আমাদের কাজ হলো সেগুলো আবিষ্কার করা, তারপর পৃথিবীর সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া।”
অ্যালিসার চোখ বড় বড় হয়ে উঠল। সে জানত মিস্টার পেরিউইঙ্কল ঠিকই বলছেন।
“কাল, অ্যালিসা, আমি চাই তুমি স্কুলে যাও। তোমার গানের শিক্ষিকাকে জানাও যে তুমি গায়কদলে যোগ দিতে চাও। এই সপ্তাহান্তে একটা শীতের কনসার্ট হবে।”
“কিন্তু আমি জানি না…”
মিস্টার পেরিউইঙ্কল ঠোঁটের ওপর আঙুল রাখলেন।
“তোমার সন্দেহগুলোকে তোমার স্বপ্নের পথে বাধা হতে দিয়ো না, অ্যালিসা।”
“এবার যাও। তোমার কিছু হোমওয়ার্ক নেই?”
“হ্যাঁ, আছে,” উত্তর দিল অ্যালিসা। “ধন্যবাদ, মিস্টার পেরিউইঙ্কল।”
এবার অ্যালিসা দ্রুত হাঁটল না। সে ছুটে বাড়ি গেল, তার স্বপ্নের ডানায় ভর করে উড়ে।
খাবার টেবিলে অ্যালিসার বাবা-মা তার দিনটা কেমন গেল জিজ্ঞেস করলেন।
“চমৎকার,” বলল অ্যালিসা, আর তার দিদি হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল।
“চমৎকার!” সে আবার বলল।
পরদিন, মিস্টার পেরিউইঙ্কলের সঙ্গে যেমন কথা হয়েছিল, অ্যালিসা গানের শিক্ষিকা মিসেস জেলিনস্কির কাছে গেল গায়কদলে যোগ দেওয়ার কথা বলতে।
“এর চেয়ে ভালো সময়ে তুমি আসতে পারতে না,” উত্তর দিলেন মিসেস জেলিনস্কি। “আমাদের একজন গায়িকা সবে শহর ছেড়ে চলে গেছে। আমার সঙ্গে পিয়ানোর কাছে এসো। আমি চাই তুমি কয়েকটা কর্ড গাও। আমি বাজালে যা শুনবে, তার সঙ্গে মিলিয়ে গাও।”
আর সে তা-ই করল। অ্যালিসার কণ্ঠ এক সুন্দর গানের পাখির মতো উড়াল দিল।
অ্যালিসার গান শুনে মিসেস জেলিনস্কির মনে হলো তিনি যেন মেঘের ভেতর দিয়ে ভেসে যাচ্ছেন। তাঁর গাল বেয়ে চোখের জল গড়িয়ে পড়ল।
এই চুপচাপ ছোট্ট মেয়েটির মধ্যে কী অসাধারণ গুণ, তিনি মনে মনে ভাবলেন।
“অ্যালিসা,” বললেন মিসেস জেলিনস্কি, এমন গুণী ছোট্ট মেয়ের সামনে কথা জড়িয়ে যাচ্ছিল তাঁর। “কাল আমি তোমাকে একটা একক গান দেব।”
“একক গান,” উত্তর দিল অ্যালিসা, “কিন্তু আমি তো—”
তারপর সে থামল। তার মনে পড়ল মিস্টার পেরিউইঙ্কলের কথা।
সন্দেহকে কখনো তোমার স্বপ্নের পথে বাধা হতে দিয়ো না।
সে বলল শুধু একটা শব্দ।
“হ্যাঁ,” সে বলল।
“হ্যাঁ,” সে আবার বলল।
“হ্যাঁ।”
কনসার্টের রাত যখন এল, গ্রামের সবাই উৎসবমুখর ছুটির হলঘরে জড়ো হলো — অ্যালিসার বাবা-মা আর তার দিদি, তার সব সহপাঠী, কারখানার মজুররা, মিস্টার পেরিউইঙ্কলও।
তারপর সময় এল। অ্যালিসা একা মঞ্চে উঠল। মিসেস জেলিনস্কি পিয়ানোর চাবিতে আঙুল ছোঁয়ালেন।
অ্যালিসা তাকিয়ে দেখল সব মুখ, তার দিকে তাকিয়ে থাকা সব চোখ।
“আমার মনে হয় না আমি—”
অ্যালিসার দিদি ব্যঙ্গের হাসি হাসল। তার বাবা-মা কোলের দিকে চোখ নামালেন।
অ্যালিসা মুখ খুলল, কিন্তু একটা শব্দও বেরোল না।
ঠিক তখনই হলের দূরের জানালাটা হাট করে খুলে গেল। একটা হালকা কুয়াশা হলে ঢুকল। মেলিতা এসে বসল জানালার তাকে।
“কখনো, কক্ষনো সন্দেহকে তোমার স্বপ্নের পথে বাধা হতে দিয়ো না,” অ্যালিসা ফিসফিস করে নিজেকে বলল।
ঠিক তখনই অ্যালিসার মুখ থেকে বেরিয়ে এল এমন সুন্দর সুর, যা কেউ কখনো শোনেনি। শ্রোতাদের মনে হলো তারা যেন মেঘের ভেতর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে। তাদের গাল বেয়ে চোখের জল গড়াতে শুরু করল।
অ্যালিসার দিদি বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল। ছোট বোনকে নিয়ে সে আগে কখনো এত গর্ব বোধ করেনি।
সেই রাতে শহরের সব মানুষ এক স্বপ্নের ভেতরে ঢুকে পড়ল।
বাইরে, ড্রিমারিয়ামের জ্বলজ্বলে লাল সাইনবোর্ড আগের চেয়ে আরও উজ্জ্বল হয়ে ঝিকমিক করছিল।
পেম্বা উমোজার একটি গল্প